05/01/2026
আজকের দিনেই বড্ড অকালে নিভে গিয়েছিল সেই প্রদীপ। তখন তাঁর বয়স মাত্র পঞ্চাশ। গানের জগতের ওই বয়সে তো শিল্পীর কণ্ঠ আরও পরিপক্ক হয়, আরও দরাজ হয়। অথচ ১৯৮৩ সালের ৪ঠা জানুয়ারি, শীতের এক বিষণ্ণ সকালে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন তিনি। তিনি সাগর সেন। যাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত পেয়েছিল এক অনন্য ‘রোমান্টিক’ ও ‘মেদুর’ রূপ।
ভাগ্য কি অদ্ভুত, তাই না? ১৯৬৮ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যে গানটি গেয়ে তিনি রাতারাতি শ্রোতাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছিলেন, সেই গানের কথাগুলোই যেন শেষ জীবনে তাঁর ভবিতব্য হয়ে দাঁড়াল— “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান”। সত্যিই তো, মারণরোগ ক্যান্সার যখন ১৯৮১ সালে তাঁর গলার দখল নিল, তখন তো সেটা বিষপানের চেয়ে কম যন্ত্রণার ছিল না। তবুও আমৃত্যু সুরকে আঁকড়ে ধরেই বাঁচতে চেয়েছিলেন।
অথচ এই মানুষটির শুরুটা ছিল সংগ্রামের। ১৯৩২ সালের ১৫ই মে ফরিদপুরে জন্ম। শৈশবের সেই অবিভক্ত বাংলার স্মৃতি বুকে নিয়ে দেশভাগের যন্ত্রণায় সপরিবারে চলে আসেন কলকাতার বরানগরে। ঘরছাড়া হওয়ার সেই হাহাকার আর বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান কি অজান্তেই মিশে গিয়েছিল তাঁর গায়কীতে? হয়তো তাই। দেবব্রত বিশ্বাস, পঙ্কজ মল্লিক বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দরাজ গলার ভিড়ে সাগর সেনের কণ্ঠ ছিল এক পশলা স্নিগ্ধ বৃষ্টির মতো—বড্ড শান্ত, বড্ড আপন। ১৯৫৮ সালে রেডিওর তরঙ্গে যখন প্রথম তাঁর গলা ভেসে এল, শ্রোতারা বুঝলেন—এ এক অন্য আবেগ।
শুধু কি রবীন্দ্রসঙ্গীত? আধুনিক গানেও তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। সলিল চৌধুরীর সুরে ‘এ জীবন এমনি করে আর তো সয় না’ কিংবা সবিতা চৌধুরীর সঙ্গে ডুয়েট ‘তৃষিত নয়নে এসো’—বাঙালি অবাক হয়ে শুনল সেই নিবেদন। আবার ১৯৮০ সালে ‘আবির্ভাব’ ছবিতে সুরকারের ভূমিকাতেও তিনি ছিলেন অনবদ্য। ১৯৭৪-এ ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’ ছবিতে প্লেব্যাক, কিংবা ‘পরিচয়’ ছবিতে ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে’ গেয়ে সেরা গায়কের পুরস্কার—সাফল্য তাঁকে ছুঁয়ে গেছে বারবার।
ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম জড়িয়ে আছে আরও এক বিশেষ কারণে। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস। কলকাতায় প্রথম দূরদর্শনের পর্দা উন্মোচিত হচ্ছে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন সাগর সেন, পাশে ছিলেন সুমিত্রা সেন। গেয়েছিলেন— ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’। আজ তিনি নেই, কিন্তু সেই আকাশ ভরা তারার মাঝেই তিনি নক্ষত্র হয়ে জ্বলছেন।
‘রবি রশ্মি’র মতো সঙ্গীত শিক্ষায়তন গড়ে তোলা কিংবা ‘শাপমোচন’, ‘বাল্মীকি প্রতিভা’র মতো গীতিনাট্যে তাঁর কণ্ঠের জাদু—সবই আজ স্মৃতি। ১৯৭৪-এ গ্রামাফোন কোম্পানি থেকে বের হওয়া তাঁর প্রথম লং প্লে রেকর্ড ‘পূজা ও প্রেম’ আজও বহু বাঙালির সংগ্রহের রত্ন। ‘অলি বারবার ফিরে যায়’ বা ‘কতবারো ভেবেছিনু’ গানগুলো যখনই বাজে, মনে হয় সাগর সেন আমাদের পাশেই আছেন।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে সেই মরমী শিল্পীর প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম। নশ্বর শরীর চলে যায়, কিন্তু যে সুর তিনি বেঁধে দিয়ে গেছেন বাঙালির প্রাণে, তা কোনোদিনও মুছে যাওয়ার নয়।
(সংগৃহীত)