29/05/2025
আজ তাঁর জন্মদিন। জন্মেছিলেন বাঁকুড়া শহরে। মেধাবী, কৃতী ছাত্র, পণ্ডিত।
লেখালেখি,পত্রিকা প্রকাশ তাঁর নেশাকে পেশায় পরিণত করেছিলেন। খ্যাতি রাজ্য, দেশ ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে।
বিশ্ববরেণ্য সাংবাদিক ও সম্পাদক। নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর সেই বাংলা প্রবাসী ও ইংরাজি মডার্ন রিভিউ প্রকাশ ঘটত। আবার হিন্দি ভাষার " বিশাল ভারত"ও।
এছাড়া দাসী, ধর্মবন্ধু এবং প্রদীপের সম্পাদনাও করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ ঘটত। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
কবিগুরুর অনুরোধে বিশ্বভারতীর অধ্যক্ষের দায়িত্বও সামলেছেন।
রামকিঙ্কর বেইজকে তিনিই তাঁর শিল্প প্রতিভা স্ফুরণের উপযুক্ত স্থানে হাজির করেন। এবছরটি তারই শততম বর্ষ।
বাঁকুড়া সম্মিলনী ও পরবর্তীকালে মেডিকেল কলেজ, কিংবা বিষ্ণুপুরে শিল্প স্থাপনের তাঁর প্রয়াস চিরস্মরণীয়।
জন্মদিনে তাঁকে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
এখানে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বড্ড বেমানান। নিজেকে ছোটো করা হয়। সচরাচর না করেই থাকি। কিন্তু প্রাসঙ্গিক ভাবে আজ উল্লেখ করেই ফেললাম। সেজন্য আমি পাঠকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
আসলে বাংলার এক বিশিষ্ট জন বাংলা আর ইংরেজি দুটো ভাষাতেই সমান হাত চলত, এরকম লেখক, সাহিত্যিক, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদের কথা উল্লেখ করছি। তিনি ড. অশোক মিত্র মহোদয়।
ডা. অশোক মিত্রের মনন চিন্তনে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের স্থান কেমন ছিল, কী রকম শ্রদ্ধাবোধ ছিল তারই স্বল্প আলোচনা।
২০০৪। ঠিক করলাম পত্রিকা প্রকাশ করব। কয়েকজন সঙ্গীর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। সভা হল। পত্রিকার অভিমুখ ঠিক হল। নামকরণ হল। সরকারি জায়গায় RNI registration এর আবেদনও হল।
কেমন যেন উচ্চাশা পেয়ে বসল। করলাম একটা রিং। তখন ল্যান্ড ফোন। সম্মতি দিন ক্ষণ নির্দিষ্ট হল ডা. মিত্রের বাড়িতে যাওয়ার।
যেতেই চায়ের সঙ্গে সদ্য প্রস্তুত হাল্কা কিছু খাবার। তখনও তাঁর স্ত্রী বেঁচে। একত্রে তিনজন বসলাম। চা-টা ড. মিত্রই করে খাওয়ালেন। এটাই নাকি তাঁর আপ্যায়ন। এক্কেবারে শেষ সাক্ষাৎকার পর্যন্ত যার ব্যতিক্রম হয়নি।
এবার বাঁকুড়ার সাম্প্রতিক কিছু প্রশ্নের উত্তর জেনে বললেন লিখুন। ওরে বাবা। কী বিপদ। সংকোচের সঙ্গে লিখতে থাকলাম। উনি প্রায় এক নাগাড়ে, যাকে ইংরেজিতে বলে নন স্টপ বলতেই রইলেন। তবে ধীর লয়ে। তাঁর কাছে আমি তো একটা ৬ মাসের শিশু।
লেখার প্রসঙ্গ : বাঁকুড়া।
শিরোনাম : কাদের বাঁকুড়া।
দেবীপ্রসাদ আর ভ্রাতা কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, তাঁদের পিতা বসন্তরঞ্জন, আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, রামকিঙ্কর বেইজ সহ নানা ব্যক্তি ও জেলার ইতিহাস সংস্কৃতি। শেষ করলেন দুই আদিবাসী রমণীর কথা দিয়ে। মন্ত্রী থাকাকালীন স্বল্প ভাষণ হেতু তালডাংরার সভাশেষে গাড়ির কাছে এসে প্রশ্ন করে "এত কম বলবি তো আসলি কেনে?" প্রবন্ধের শেষটা করলেন আগামী বাঁকুড়া এদেরই হাতে ।
আর বলতে বলতে কথা শেষ হল - " এই আমার বাঁকুড়ার প্রতি ঋণের খানিক পরিশোধ করলাম আপনার পত্রিকায়।"
বাংলার আভাষের প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যা প্রথম প্রবন্ধ " কাদের বাঁকুড়া"। লিখেছেন, মধ্য দুপুরে (পদ্মার ওপারে বাড়ির কথা উল্লেখ করেই) পরিবারের বড়োরা যখন নিদ্রামগ্ন হতেন তখন বইয়ের আলমারি থেকে পাট খুলে প্রবাসী পড়তেই দুপুরটা কাটিয়ে দিতেন। বলতে চেয়েছেন সাহিত্য ভাবনা তখন থেকে মস্তিষ্কে প্রোথিত হতে থাকে। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, মডার্ন রিভিউ আরও নানান। কিন্তু রামানন্দ আর যোগেশচন্দ্র যেন সবার উপরে।
এই ইনিই ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে ভারত সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। এই ইনিই ইন্দিরা গান্ধীর স্বৈরাচারী কার্যকলাপের প্রতিবাদ স্বরূপ চাকরি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন অনির্দিষ্টের উদ্ধেশ্য।
অশোক মিত্র যাঁর নামের আগে ড. যোগ হয় কার কাছে জানেন? অর্থনীততে নোবেল চালু হল, প্রথম নোবেল যিনি পেলেন তাঁর কাছে।
ইনিই সেই ব্যক্তি ছেড়ে আসার সময় আমলারাবর উত্তরসূরী জানতে চাইলেড. মনমোহন সিংহের নাম বলেন। তাঁর কথায় ( ভিডিও আছে) " ওই যে লেখে না, জয়তী। জওহরলাল ইউনিভার্সিটির জয়তী ঘোষ। তার বাবা অরুণ ঘোষ আর মনমোহন এই দুইজন ছিল। আমি মনমোহনের পক্ষে বলি। এই কারণে যে অরুণ তো বাঙালি। বাঙালি প্রীতির দোষে দুষ্ট না হই।
ভিডিওতে আরও আছে " এই তো সেদিন এসেছিল মনমোহন। ওই আপনি যে চেয়ারে বসে আছেন ওইখানে বসেছিল। "
ড. মনমোহন সিং ভারত রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে স্যার বলতেন, তার জন্য তাঁর মধ্যে কোনওরকম আত্মগরিমা ছিল না। বরং উদারীকরণের চূড়ান্ত বিরোধিতায় মগ্ন থেকেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক কিছু সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই লড়তেও চেয়েছেন।
এরকম মানুষেরাই তো বামপন্থী। ত্যাগী নিষ্কলুষ। তাঁদের সঙ্গ পেয়ে আমি নই আমরা যাঁরা এই মতাদর্শে বিশ্বাসী, টুকটাক কাজ কম্ম করি গর্বিত তার জন্যে।
কিন্তু বাঁকড়ি সন্তান রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের উপর কেমন শ্রদ্ধা বোধ ছিল তাঁর একটি ঘটনার কথা দিয়ে উপসংহারে আসি।
বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের এক সেমিনারে এসেছেন। বক্তব্য শেষ হতেই আমায় ডাকলেন বললেন, আমি বাঁকুড়ার তিনটি জায়গায় যেতে চাই। আমায় নিয়ে চলুন।
আমি যেতে চাই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি,
যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির বাড়ি,
আর যেখানে প্রথমে যেতে চেয়েছিলেন সে আর অন্য কোথাও না।
বাংলার আভাষের দপ্তর।
গেছিলাম তিনটি স্থানেই। যোগেশচন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে তাঁর নাতিকে বললেন, উনি যেখানে পড়া লেখা করতেন সেখানে নিয়ে চলুন।
ঘরের এক্কেবারে ভেতরে কাকপক্ষীও টের পাবেনা সেরকমই এক উপাসনা কক্ষ। মিত্র মশাই যেন চোখ বন্ধ করে নিস্তব্ধ রইলেন। মনে হচ্ছিল উনি ধ্যানে মগ্ন। বুঝলাম ঈশ্বরে অবিশ্বাসী মানুষের প্রয়াত বিদ্যানিধির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির দরজাতেও নিশ্চল রইলেন। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে কেমন যেন একটা হয়ে গেলাম।
আর যেখানে প্রথম যেতে চাইলেন, সেই বাংলার আভাষ দপ্তর। নিজের বাড়ি নিয়ে যাই তার স্পর্ধা হল না। গেলাম পত্রিকার সভাপতি অধ্যাপক সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্যের গৃহে।
সে তো আরও অবাক হলাম। সিদ্ধার্থ স্যারের বাড়ি নদিয়ায়। তাঁর বাবা, পিশি ওই এলাকার পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ আরও অনেকে তাঁর পরিচিত। স্যারের সঙ্গে হয়তো সাক্ষাৎ প্রথম আলাপ। কিন্তু সবই উনি জানেন। গর্ব হল বৈকি।
বাসে যেতে যেতে কোনরকম ফিরে দেখার সুযোগ পেলাম না। ভুল ভ্রান্তি হলে মার্জনা করবেন।
আর আজ যাঁর জন্মদিন তাঁর জন্ম বাঁকুড়ায়। অতি ক্ষুদ্র পত্রিকা বাংলার আভাষ সম্পাদনা সেই বাঁকুড়ায়।এই অধমের দ্বারা।
একটু অন্যভাবে মনীষীকে শ্রদ্ধা জানানো জন্মস্থান বিচারে। সংকীর্ণতা এসেই গেল। কিন্তু গর্বও যে।
২০১১ তে পটপরিবর্তনে যে আক্রমণ নেমে এল তা বামপন্থীদের উপরই নয়। সমগ্র সমাজের উপরে। শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি, ঐতিহ্য কীসে নয়। এমনকি ইতিহাস বিকৃতিতেও।
ছোটো থেকে শুনে এসেছিলাম স্বৈরাচার শাসকের কাছে প্রথম আক্রান্ত হয় বামপন্থীরা। তারপর জনগণের উপরেও মারণ খাঁড়ার কোপ পড়ে।
তালডাংরায় বামকর্মী, দক্ষ সংগঠক অজিত লোহারকে সাপের মতো পিটিয়ে মারা হল। সেটা ছিল রাজ্যের পরিবর্তনের অন্যতম এক রূপ।
কালক্রমে আজ আরজিকরের অভয়ার উপরে বর্তালো। না, রাজনীতি করবে না বললেও পার পেলেন না ডা. দেবাশিস, ডা. অনিকেত কিংবা ডা. নাইয়া।
পার পেল না আমাদের পরের প্রজন্মের ২৬০০০ শিক্ষক শিক্ষাকর্মী। পার পাবে না। পাবেন না কেউই।
এখানে নির্দোষীরা সাজা পাচ্ছে। আর চোর, ভণ্ড, প্রতারকের দল খিল খিল করে হাসছে। আর কেউ প্রশ্ন করলেই বলছে তুই করিসনি তো কী! তোর বাবা জলঘোলা করেছে।
কিংবা, উওরপ্রদেশে কী হয়েছিল, ত্রিপুরাতেও হয়েছে। তাহলে আমরা করব না কেন?
যেন হাম কিসিসে কম নেহি।
চলছে মিথ্যাচারের পর মিথ্যাচার।
সাংবাদিকতার জগতে আজকের দিনে তাই রামানন্দকে বড়োই দরকার ছিল। যিনি সত্যের থেকে এক চুলও সরে আসেননি কোনও দিন।
সেই মহান প্রজ্ঞাকে জন্মদিনে শতকোটি প্রণাম।
collected
#বাঁকুড়া