24/04/2019
অক্সিজেনের সিলিন্ডার ছাড়া এভারেস্ট
-অভিষেক তুঙ্গ
****************
'মৃত্যুর থেকে ভালো যদি কিছু হয়, খুব বাজে রকমভাবে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, নিজের বাড়িকে, বৌকে চিনতে পারবেনা...'
যখন প্রথমবার অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া এভারেস্ট চড়ার কথা ভেবেছিলেন রেনল্ড মেসনার এবং পিটার হাবলার, এই কথাগুলোই শুনতে হয়েছিল। তার আগে ডাক্তাররা প্রমাণ করে দিয়েছে অতিরিক্ত অক্সিজেন ছাড়া এভারেস্ট চড়তে যাওয়া 'সুসাইড এটেম্পট'।
৮,৮৪৮ মিটার উচ্চতায় অক্সিজেন এবং বায়ুর প্রেসার আমাদের সমতলের এক তৃতীয়াংশ! তাতে কি হয়? পাতলা বায়ুতে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, সাথে দেহের সাথে কম প্রেসার ডিফারেন্সের জন্যেও। উলটে বডি ঠিকমত এক্লামাইটেজেশন না হলে, অর্থাৎ বডি প্রেসার না কমালে ফুসফুসে জল জমতে শুরু করে, লালরক্তক্ণিকা না বাড়লে অক্সিজেনের অভাবে মস্তিষ্ক ফুলতে শুরু করে, শরীর খাওয়ার হজম করতে পারেনা, দেহের বিভিন্ন অংশে পচন ধরতে শুরু করে.. অনেকেই বলেন অক্সিজেন মাস্ক লাগানো মানে এভারেস্টের উচ্চতা আসলে ২০০০ মিটার কমিয়ে দেওয়া..
প্রথমবার চেষ্টার পরে যখন মেসনার এবং হাবলার সাউথ কল থেকে ঝড়ের মুখে পড়ে ফিরে আসতে হয়েছিল, হাবলার পালিয়ে যেতে চেয়েছিল বেস ক্যাম্প ছেড়ে, সদ্য একবছর আগে বিয়ে করেছে, বাড়ি গিয়ে যদি বৌকে না চিনতে পারে! মেসনার আবার বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করায় হাবলারকে এবং আবার ওঠার চেষ্টা করে, আর যাই হোক,দুই আল্পাইনিষ্ট একসাথে অক্সিজেন ছাড়া এর আগে গরশেব্রুম ক্লাইম্ব করেছে!
৮ই মে,১৯৭৮, বিজ্ঞানকে ভুল প্রমাণিত করে প্রায় হামাগুড়ি দিতে দিতে অতিরিক্ত অক্সিজেন ছাড়া মেসনার এবং হাবলার এভারেস্টের মাথায় গিয়ে দাড়ালো! বিজ্ঞানীরা আবার নতুন করে হিসাব কিতাব শুরু করলো..তারপর আজ অব্দি অতিরিক্ত অক্সিজেন ছাড়া আরো প্রায় ২০০ জন এভারেস্টের মাথায় গিয়ে দাড়িয়েছে।
সিক্রেটটা ঠিক কি?
অনেকেই বলেছিল মেসনাররা ছিল জিনেটিকালি আলাদা, তাই সম্ভব হয়েছিল, তারপর একে একে আরো ২০০ জনের ক্লাইম্ব সেই ধারণা ভেঙে দিল.. হ্যা, সিক্রেট হল সঠিক ট্রেনিং পদ্ধতি।
আমাদের শরীরের শিরা উপশিরাগুলো শরীরের শেষপ্রান্ত অব্দি অক্সিজেন নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, যত এই জালিকা বাড়বে শরীরের দূরদূরান্তের কোষ বেশী কাজ করবে, তার এরোবিক ক্ষমতা তত বাড়তে থাকবে, যেটাকে আমরা বুঝি দম নামে। অর্থাৎ আমাদের শরীরটাকে অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাবলে ট্রেনিং এর মাধ্যমে এই ট্যাংকের সাইজ বাড়ানো যায়, শেরপাদের জন্মগত ভাবেই এই ট্যাংকের সাইজ বড় থাকে, বাকিরা ট্রেনিং এর মাধ্যমে সেই জায়গায় পৌছুতে পারে। রানিং সাইকেলিং সুইমিং স্কিং সবকিছুর সিক্রেট হল এই এরোবিক ক্যাপাসিটি, কিন্তু রানিং এর ক্যাপাসিটি নিয়ে যেমন সাইকেলিং হয়না, তার জন্য সাইকেলিংটাও প্র্যাক্টিস করতে হয়, মাউন্টেনিয়ারিং এরোবিক ক্যপাসিটির জন্য তেমনি মাউন্টেনেই প্র্যাক্টিস করতে হয়। আর এই ট্রেনিং পুরোপুরি এরোবিক ট্রেনিং.. মেসনার এই ক্লাইম্বিং এর আগে পাহাড়ে দৌড়াত, হিবলার স্কিং করতো।
এটা যদি এতটাই ওপেন সিক্রেট হয় তাহলে প্রায় হাজার পাচেক এভারেস্ট সামিটার্সের মধ্যে মাত্র ২০০ জন কেন অতিরিক্ত অক্সিজেন ছাড়া ক্লাইম্ব করলো?
কারণ এর ট্রেনিং চলে প্রায় ১০ বছর ধরে, যেকোনো সাবজেক্টএ এক্সপার্টাইজি পেতে গেলেই ১০ বছর লেগে থাকতে হয়, সে ব্ল্যাকবেল্ট হোক বা তিনঘন্টার মধ্যে ম্যারাথন.. আনমাস্কড এভারেস্টের জন্যেও তাই অন্তত ১০ বছরের প্রস্তুতি জরুরী! সেই সময়টুকু সবাই কি দিতে আগ্রহী? তারপরও অক্সিজেন ছাড়া সাফল্যের হার মাত্র ১০%, সেই অনিশ্চয়তা কি মহার্ঘ্য এভারেস্টে সবাই নিতে রাজি?