18/07/2025
১৬ই জুলাই শহর জাগানো মিছিলের পর সবাই চলে গেলেও আমরা ক'জন ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে বসি। এবং আগামীকাল কী কর্মসূচি করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা শুরু করি। আলোচনার সময় আমরা আওয়ামী লীগকে প্রতিহত করার জন্য মশাল মিছিলের প্ল্যান করি। আমরা চিন্তা করি, সারাদেশে আওয়ামী লীগ হায়েনার মতো আক্রমণ করছে। সুতরাং আমাদের উপরও করতে পারে। তাই আমরা মশাল মিছিল করব, যাতে করে আমাদের উপর কোনো আঘাত আসলে তা প্রতিহত করতে পারি। এবং এটাই সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়।
১৬ই জুলাই রাতে আমরা যখন আন্দোলনের জন্য মানুষ খুঁজছিলাম, তখন একটা গ্রুপে একজন নম্বর দিয়ে বলে, "ভাই, আমি আছি।" আমি এই নম্বরে যোগাযোগ করি। সেই ছেলেটা আমাদের পরিচিত ছিল। তার সাথে অনেকক্ষণ আলাপ হয়। সে আমাকে বলে, "ভাই, আমি হোয়াটসঅ্যাপে একটা গ্রুপ খুলেছি কোটা আন্দোলনের। সেখানে প্রায় ১,০০০ মানুষ আছে।" আমি বলি, "ওকে, ঠিক আছে। তুমি আমাকে অ্যাডমিন দাও, আমি দেখছি।" এভাবে যোগাযোগ করতে করতে রাত প্রায় ২টা হয়ে যায়।
১৭ই জুলাই সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আব্বার প্রশ্ন, "দোকানে যাবি না?" আমি বললাম, "না, আমার চোখে একটু সমস্যা। আমার ডাক্তার দেখাতে যেতে হবে।" ব্যাস, এই বলে আল্লাহর নাম নিয়ে বাড়ি থেকে সকাল ৯টা/১০টা হবে, বের হয়ে গেলাম। সত্যি সত্যিই ওই দিন চোখে কিছুটা সমস্যা করছিল। আমি টাউনে গিয়ে বন্ধু সাইদুলকে কল দিলাম, সে আগে থেকেই শহরে ছিল। আমি প্রথমে তাকে সাথে নিয়ে মাতারকাপন চক্ষু হাসপাতালে চলে গেলাম। এবং যেতে যেতে রাজিব দা, সামায়েল, শিশির, নিজামদের সাথে যোগাযোগ শুরু করলাম।
আমি ডাক্তার দেখানো শেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে গেলাম, যেখানে ইতোমধ্যে ৩/৪ জন উপস্থিত ছিলেন। তাদের সাথে নিয়ে কীভাবে কী করা যায়, প্ল্যান করা শুরু করলাম। এবং এখানে বসেই একটা অনলাইন ব্যানার রেডি করা হলো প্রচারের জন্য। আমি এর আগে কখনো মশাল মিছিল করিনি। এর জন্য এসবের দায়িত্ব তাদের ওপরই ছিল। আলাপ-আলোচনা এবং জনসমর্থনের জন্য যোগাযোগ করতে করতে মধ্যাহ্নভোজের সময় হয়ে গেল। আমরা সবাই মিলে খেতে যাই। এসময় সময় টিভির সাংবাদিক আমাদের মধ্যে একজনকে কল দেয়। এবং সে বলে, "কলেজ ক্যাম্পাসে কারা জানি মিছিল করছে?" আমরা তাড়াহুড়ো করে খাওয়া শেষ করে কলেজের দিকে মুভ করি। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই কোনো মিছিল নয়। আসলে এটা একটা ট্র্যাপ ছিল আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দেওয়ার। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করেন।
কলেজ থেকে আসার পর আমরা অফিসে বসে আছি। এসময় হঠাৎ বিশ্বজিৎ দা বলেন, "তাদের মশাল রেডি না।" পড়লাম মহা বিপদে। আসরের সময় প্রায় নিকটবর্তী। এখন কোথা থেকে মশাল রেডি করব? এই নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন তারা বললেন, "বাঁশ শাহমস্তফা রোডে মিলবে।" সাথে সাথে আমি, নিজাম এবং আমার চাচা সায়েম বাঁশের খোঁজে শহরের নানান প্রান্তে ছুটলাম। কিন্তু মশালের মতো বাঁশ কোথাও পেলাম না। হঠাৎ নিজাম বলে, "নাহিদা আপুর (পরিষদের বর্তমান জেলা সহ-সভাপতি) বাসায় বাঁশের বড় ঝাড় আছে, চলো সেখানে।" আমরা সেখানে গেলাম এবং আপুর বাসা থেকে একটা দা নিয়ে বাঁশ বাগানের পাশে গেলাম। আমি, সায়েম, নিজাম উত্তপ্ত রোদে কয়েকটি বাঁশ কেটে মশালের জন্য প্রস্তুত করলাম।
আমি একদিকে বাঁশ কাটছি, অন্যদিকে মানুষের ফোন এবং কল রেসপন্স করছি। কারণ ব্যানারে আমার নম্বর দেওয়া ছিল। হঠাৎ রাজিব দার ফোন, "কাদির, অনেক মানুষ আসছে, বাঁশ লাগবে না। তোমরা চলে আসো, আমরা মিছিল করব।" আমরাও আর কিছু চিন্তা না করে চৌমুহনাতে চলে আসলাম। এসে দেখি কিছু সংখ্যক ছাত্র উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু এই সংখ্যাটা সন্তোষজনক নয়। আমার এলাকা থেকে ওই দিন আমার ডাকে সাড়া দিয়ে, ফেরদৌস, জামিল, শাহ আলম সহ আরও বেশ কয়েকজন উপস্থিত হয়।
আমরা যখন এক হয়ে মিছিলের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের মানুষ আমাদের থেকে একটুখানি দূরে বিভিন্ন স্লোগান তোলে। যা দেখে প্রাথমিকভাবে সবাই কিছুটা ভয় পেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অনেকে সামনে আসতে ভয় পাচ্ছিল। তখন আমি বলি, "আমি সামনে আছি, মিছিল করবই করব।" আমি যখন সামনে যাই, তখন সায়েম এসেও আমার হাত শক্ত করে ধরে। এবং আমার এলাকার ভাই-ব্রাদার আমার পেছনে দাঁড়ায়, যাতে আক্রমণ হলে অন্তত আমাকে সেফ করতে পারে। মিছিল শুরু করে আমরা সরকারি স্কুলের রোড পর্যন্ত গিয়ে অবস্থা বেগতিক দেখে ব্যাক করি। এবং চৌমুহনাতে আসার পূর্বেই আমরা পুলিশের বাধার সম্মুখীন হই। পুলিশের বাধা অতিক্রম করে আমরা যখন চৌমুহনাতে যাই, ঠিক তখনই আওয়ামী লীগের গুন্ডারা আমাদের পেছন থেকে হামলা করে। এবং আমাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এদিন হামলার শিকার হওয়ার জন্য আমি মনে করি ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রফ্রন্টের নেতাকর্মীরা দায়ী (এটা আমি মনে করি)। এবং শিশির আপুকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করি উনি কোথায়? কারণ ওনার পরীক্ষা ছিল, আর যেহেতু মশাল মিছিল হবে, তাই সন্ধ্যার পূর্বেই তিনি টাউনে প্রবেশ করেন। কিন্তু ততক্ষণে আমরা মিছিল শেষ করে যার যার বাড়ির পথে। তখন আমি আপুকে কল দিয়ে বলি, "আজকে আমরা এদের জন্য হামলার শিকার হয়েছি। তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদের সাথে আর মিছিল করব না।" তখন আপু বলেন, "তোমার সাথে যারা আছে, তাদেরকে নিয়ে একটা সেফ জায়গায় বসার ব্যবস্থা করো।" আমি কোথায় সেফ জায়গা খুঁজে না পেলে, আপুকে কল দেই। আপু বলেন, "তাহলে তুমি সবাইকে নিয়ে নাহিদা আপুর বাসায় চলে আসো।" এদিন রাতে আমরা ২০/২২ জন মিটিং করি, যাদের পরিচয় ছিল শুধু সাধারণ শিক্ষার্থী।
বি:দ্র: এখানে যাদের নাম নিয়েছি, তারাই যে শুধু আন্দোলন করছেন তা নয়। আমি আমার বিশেষ মুহূর্ত শেয়ার করছি এবং কীভাবে আন্দোলন ম্যানেজ করছি, তা। জুলাই আন্দোলনে যারাই অংশগ্রহণ করছেন, প্রত্যেকেই আমার সহযোদ্ধা এবং একেকজন জুলাই যোদ্ধা। প্রত্যেকের প্রতি একরাশ ভালোবাসা। 🇧🇩❤️
✍️আব্দুল কাদির তালুকদার