05/02/2024
শুভ জন্মদিন— নেইমার জুনিয়র!
যাত্রাটা শুরু হয়েছিলেন আজ থেকে ৩২ বছর আগে, ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের মগি দাস ক্রুজেসে নেইমার সান্তোস সিনিয়রের ঘরে ভালোবাসার প্রতিক হিসেবে তার ঘর আলোকিত করে পৃথিবীর আলো বাতাসের সাথে প্রথম পরিচিত হন এক বিস্ময়! বাবার নামের সাথে মিল রেখে নাম রাখা হয় নেইমার সাথে ছোট্ট নেইমারের নামের শেষে যুক্ত হয় জুনিয়র!
নেইমার জুনিয়রের গল্পের ইতি ঘটতে পারতো চারমাসের মাথায়! নেইমারের জন্মের অল্প কিছু দিন পরের ঘটনা, সাও পাওলোর এক বৃষ্টিস্নাত অপরাহ্নে সাথে পত্নী ও চার মসের নেইমারকে সাথে করে খাড়া পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন নেইমার সান্তুোস সিনিয়র! পাহাড়ি রাস্তার উল্টোদিক থেকে মদ্যপ এক ড্রাইভার বেপরোয়া ও লাগামহীন ভাবে ছুটে এসে সংঘর্ষ লাগালেন নেইমার সিনিয়রের গাড়ির সাথে! ফলে যা হওয়ার তাই হলো সরু পাহাড়ি রাস্তায় জনসমক্ষের চোখের আড়ালে ঘটে গেলো এক ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা!
মা-বাবাকে নিয়ে খুব একটা চিন্তা না হলেও মাস চারেকের শিশুটিকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিলো ডাক্তার দের মনে, তবে পৃথিবীর সকল যোদ্ধাদের গতি থাকে বাধার গতির চেয়ে কয়েকশো কে পি এইচ বেশি! তাইতো সবাইকে অবাক করে দিয়ে কোনো এক অলৌকিক শক্তিবলে সেদিন মৃত্যুমুখ থেকে বেঁচে ফিরলো মাস চারেকের শিশুটি! সেদিন দুবার সূর্যোদয় হলো একবার পুব আকাশের কোণে সূর্য উঠলো আরেকবার মায়ের কোলে জুনিয়র নেইমার ফেরৎ এলো! হয়তো বিধাতা নিজেই চেয়েছিলেন তার সব থেকে তেজি অগ্নিমানবকে পৃথিবীতেই আগলে রাখতে!
বাবার কল্যানে ছোটবেলাতেই হাতেখড়ি হয়েছিল ফুটবলের সাথে! বাবার ইচ্ছে ছিল নিজে ফুটবলার হওয়ার কিন্তু দারিদ্র্যের গ্যাঁড়াকলে সে স্বপ্ন পুরণ হয়নি! তাই জন্মের পর তার ইচ্ছাতেই ফুটবলকে নিজের ধ্যানে-জ্ঞানে লালন করে বেড়ে উঠেন নেইমার! জন্ম হয়েছিল এমন এক দেশে যেখানে ফুটবলের প্রতিভাকে মেলে ধরার সেরা স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়!
ব্রাজিলের অন্য আঁট দশটা পরিবারের মতো তার পরিবারেও ছিল দরিদ্রের ছোঁয়া তবে, বাবা তাকে এসবের আঁচ লাগতে দেননি; সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন উত্তরসূরির চাওয়া পূরণ করতে! জুনিয়রের প্রতিভা ক্ষুরধার হওয়ায় সিনিয়রের কাজটাও সহজ হয়ে যায়! নেইমারের ক্ষুরধার প্রতিভার প্রথম প্রমাণ মেলে স্থানীয় ‘পর্তুগীজা সানটিস্টা’ ফুটবলে দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শনের মধ্যদিয়ে! তখনই ব্রাজিলের আকাশে বাতাসে খবর বইতে থাকে, সাও পাওলোর বস্তি থেকে ফুটবল বিশ্ব শাসন করতে আসছে আরেকজন বিস্ময়বালক— দ্বিতীয় পেলে!
সাও পাওলোর রাস্তায় ফুটবল খেলতে খেলতে ফুটবলের সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় সেদিনের ছোট্ট নেইমারের! নেইমারের বিস্ময়কর উত্থানের শুরু ২০০৩ সাল থেকে, ওই বছর তিনি সময়ের সেরা 'কিশোর প্রতিভা' হিসেবে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক ক্লাব পেলের সান্তোসে যোগ দেন 'দ্বিতীয় পেলে' ! পেশাদার ফুটবলের সঙ্গে তখন থেকেই পরিচিতি ব্রাজিলের বর্তমান স্বপ্নদ্রষ্টার!
দারুণ প্রতিভাবান নেইমার জুনিয়র অল্প বয়সেই ফুটবল বিশ্বে সাড়া ফেলে দেন! ফলে তার জন্য আগ্রহী হয়ে পরে নামীদামি ও বিখ্যাত কয়েকটি ক্লাব! তবে, ফুটবলের রাজা পেলের পরামর্শে ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব সান্তোসের হয়ে তার প্রতিভা বিকাশের সিদ্ধান্ত নেন! এরপর ২০০৯ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সেই সান্তোসের মেইন টিমে অভিষেক হয়ে যায়! এরপর দেখিয়ে যান একের পর এক ঝলক! পথ হারিয়ে ফেলা সান্তোসকে কক্ষপথে ফেরান এই ব্রাজিলিয়ান সেনসেশন!
২০১১ কোপা লিবার্টোসে তিনি ৬ গোল করে সান্তোসকে নিয়ে যান ফাইনালে এবং ফাইনালে প্রথম লেগে গোল শূন্য ড্র হলে দ্বিতীয় লেগে প্রথম গোলটি করে দলকে লীড এনে দেন নেইমার! ফলে সান্তোস চ্যাম্পিয়ন হয় সাথে নেইমার জেতেন ফাইনালের ম্যাচ সেরার পুরস্কার এবং ১৯৬৩ সালের পর আবারও সান্তোস জেতে কোপা লিবার্তাদোরেস! এবং সে বছর অসাধারণ পারফরম্যান্সের দরুন জেতেন সাউথ আমেরিকান সেরা ফুটবলারের এওয়ার্ড! এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি নেইমারকে! প্রতিভার প্রমান দিয়ে ২০১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সেই অভিষেক হয় ব্রাজিল ন্যাশনাল টিমের হয়ে!
২০১১ সালে ফ্লামেঙ্গোর বিপক্ষে এক অসাধারণ সলো গোল করেন নেইমার; মাঝমাঠ থেকে বাঁদিক দিয়ে একাই বল নিয়ে তার পায়ের জাদু দেখাতে দেখাতে ফ্লামেঙ্গোর ডি বক্সে ডুকে পড়েন নেইমার এবং তার অসাধারণ এক মাপা শর্ট খুঁজে নেয় জাল! এনিয়ে চারদিকে শোরগোল লেগে যায় এবং এই গোলের জন্য ২০১১ ফিফা পুসকাস এওয়ার্ড জেতেন! ২০১১ সালে যখন ব্যালন ডি’র এর ১০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করা হয় তখন সবার চোখ আটকে যায় ১০ নম্বরে! ১০ নম্বরে এমন এক ছেলের নাম যে কি-না এখনো ইউরোপেই খেলেনি! বর্তমান ফুটবলের সর্বোচ্চ মর্যদার ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’র এর তালিকায় ১০ নম্বরে এমন নাম দেখে অবাকই হয়েছিল বিশ্ববাসী এবং পরিচিত হয়েছিল নতুন এক বিস্ময়ের সাথে!
অতঃপর, অবিস্মরণীয় এক বছর কাটানোর পর ২০১৪ বিশ্বকাপে খেলার উদ্দেশ্য ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন নেইমার! নেইমার ইচ্ছে ছিল ইউরোপের বড় একটা ক্লাবে খেলা! ততকালীন রাইজিং স্টার নেইমারকে কেনার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছিল ইউরোপর নামীদামী বেশ কয়েকটা ক্লাব! ২৪শে মে সান্তোস নেইমারের প্রতি ইউরোপীয়ান ক্লাবের আগ্রহের খবর প্রকাশ করে! তবে, সফল হয় বার্সালোনা; প্রিয় ফুটবলার মেসির সাথে খেলার জন্য বার্সালোনায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন! এবং পরের দিন নেইমার তার বার্সালোনার সাথে চুক্তির কথা এনাউন্সমেন্ট করেন! ৫৭ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সালোনা তাকে সাইন করায় এবং ৫৬ হাজার দর্শকের সামনে ক্যাম্প নু তে প্রেজেন্ট করায়! এরমধ্যেই শেষ হয় নেইমারের ব্রাজিলের অধ্যায় এবং শুরু হয় ইউরোপ জয়ের যাত্রা!
এনরিকের হাত ধরে সুসজ্জিত বছর তেইশের তরুণ পা রাখলেন নু ক্যাম্পে! এসেই তরুন নেইমার সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেখিয়ে চলেন একের পর এক প্রতিভার ঝলক! খুব দ্রুতই জায়গা করে নেন সবার হৃদয়ে। ভুবন-ভোলানো ফুটবলীয় জাদুতে মুগ্ধ করেন কাতালানদের!
লোকে বলে, যে রোম্যান্টিক সে কখনো ডেস্ট্রাক্টিভ হয়না! কথাটা মেনে নিতে পারেননি নেইমার। করে দেখালেন হয়; গোটা স্পেন দেখল রোম্যান্সের সাথে ডেস্ট্রাকশন! সঙ্গী কখনো আলভেস, ইনিয়েস্তা, সুয়ারেজ আবার কখনো মেসি!
শারীরিক গঠন নিয়ে বিদ্রুপ মন্তব্য করায় ছোটবেলায় একবার মেজাজ হারিয়ে কোচকে করেছিলেন গালিগালাজ! তার ভিতরের সেই আগুনটা ফুটবলের রোম্যান্স হয়ে মহাকাব্য লিখে ফেললো খুব দ্রুত! মেসি সুয়ারেজকে সঙ্গী করে গড়ে তুলেন সময়ের সেরা আক্রমণ ত্রয়ী এম'এস'এন! তাদের সঙ্গী করে পার করলেন জীবনের সুনালী সময়গুলো!
তারপর একে একে ক্যাম্প ন্যুয়ের ফ্ল্যাট লাইট গুলো নিভে গেলো, আস্তে আস্তে শেষবার সে নিঃশাস ফেললো ঘাসগুলোতে! একবস্তা স্মৃতি আর কয়েকশো লড়াইয়ের আতর ফেলে প্যারিসগামী ফ্ল্যাইটে উরে গেলো পার্ক দি প্রিন্সের ঠিকানায়, উড়ে গেলো এক ঝাঁক হলুদ পাখি!
কিন্তু রোম্যান্সের মৃত্যু নেই, যোদ্ধার মৃত্যু নেই! তার পা ছুটছিলই! মেসি, সুয়ারেজের জায়গায় তখন এম্ব্যাপে, ডি মারিয়া! তাঁর চিরসংগ্রাম হয়তো তাকে এখানেও এনে দেবে সন্মান আর খেতাবের ডালিগুচ্ছ!
যোদ্ধার কোনো স্থান নেই, কাল নেই, পাত্র নেই! তাইতো মারাকানা থেকে ক্যাম্প নু কিংবা পার্ক দা প্রিন্সেস মাঠের সবুজ ঘাস গুলো সর্বদাই ভিজে থাকে নেইমারদের লড়াইয়ের ঘামে!
ছেলেবেলায় দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াই, স্কুলে অবজ্ঞার বিরুদ্ধে লড়াই, কলম্বিয়া ম্যাচে ওই ইনজুরিটার পর ডাক্তার বলেছিলো "আর দু সেন্টিমিটার ওপরে লাগলে কোনোদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতেন না নেইমার" সেখান থেকে আবারো ফুটবল মাঠে ফিরে আসা, সেটাও এক প্রকার লড়াই বা বলা বাহুল্য জীবনের শ্রেষ্ট লড়াই!
একজন নেইমার তো এমনই, একজন নেইমার তো হেরে যাওয়ার পাত্র নন, নেইমার তো পিছিয়ে পড়ার পাত্র নন, জন্ম থেকে জীবনযুদ্ধে চরম চড়াই উৎরাই পার করে জয়ী হউয়া এক নায়কের নামই ত নেইমার, মনে বিশ্বাস রেখে পরিশ্রম করে চেস্টা করে যাওয়ার নামই ত নেইমার, তার তো চ্যালেঞ্জ ভুলে গেলে চলেনা, তার তো যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়লে চলেনা!
নেইমার কে নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে আমাদের স্বপ্ন রয়েছে! যাই হোক দিন শেষে একটাই চাওয়া নেইমার প্রতি আরেকটু সন্মান এবং তার যোগ্যতার প্রমান দিয়ে ব্রাজিলিয়ান দের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন পূরণ হোক!
শুধু নিশিপক্ষিরা জানে কত-শত রাত জাগা, নিশাচরের চোখের নিচে কালো দাগ, যেন সে দেবদাসের ই আরেক রুপ রাত জেগে নেশা করে! কত নিশি বিনাশ হয়, ঘুম হয় বিলীন তবু মনে সাধ জাগে আপনার দু-পায়ের কারুকাজ দৃষ্টি নন্দিত ফুটবল নৈপুণ্য চলুক যুগ থেকে যুগান্তর! নিন্দুক সমালোচকরা দেখেনি চোখের কোনে লুকিয়ে রাখা আপনার প্রতি এক সমুদ্র প্রেম! শুধু নিশিপক্ষিরা স্বাক্ষী রয় আপনার প্রতি আমার এই অনন্ত ভালোবাসার!
নেইমার তো এমনই! কতশত লাখো কোটি ভক্তের নয়নের মণি, কতশত লাখো কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা! দরিদ্র এক ঘর থেকে উঠে এসে ব্রাজিল কে ফুটবলবিশ্বে প্রতিনিধিত্ব করা, নিজেকে অনন্য এক উচ্চতায় আসীন করা নেইমার - কতশত যুবক বালকের এগিয়ে যাওয়ার উদ্দীপনা! কতশত লাখো কোটি হতাশাগ্রস্থ মানুষ স্বপ্ন দেখে নতুন করে বাঁচার নেইমারের "1% chance, 99% faith" এ, পায় সফলতা অর্জনের দীপ্তিময় সাহস!
শত কোটি অজস্র ভালো লাগা নিয়ে একপলক দেখার জন্য রাত জাগা, নির্ঘুম রাতে কতো হাসি-কান্না আর আক্ষেপ নিয়ে বসে থাকা, সবকিছুর স্বাক্ষী তো এই হার না মানা অভিনেতা! ১২০ গজের খেলাটাকে রক্তে প্রবাহিত করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, ধন্যবাদ আমাদের চোখের শান্তি হয়ে শত প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে অদম্য গতিতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য!
শুভ জন্মদিন, নেইমার জুনিয়র— আমার শিশুকাল থেকে শৈশব পেরিয়ে কৈশোরের সকল ফুটবলীয় উন্মাদনা!
Md Tamim Hussain