05/06/2026
“কাঠবিড়ালি”
💘💘💘💘
প্রভাত ছিল এক অদ্ভুত স্বভাবের ছেলে। বাহির থেকে সাধারণ, কিন্তু ভেতরে ছিল এক অসাধারণ জগৎ—কবিতার জগৎ।
সে প্রতিদিন ফেসবুকের একটি কবিতার গ্রুপে লিখত। তার লেখা ছিল খুব সাধারণ ভাষার, কিন্তু শব্দের ভেতরে লুকিয়ে থাকত গভীর অনুভূতি।
কেউ লিখত— “ভালো লাগল” কেউ লিখত— “খুব সুন্দর”
কিন্তু প্রভাত কখনো বাহবা খুঁজত না। সে শুধু লিখত, কারণ লেখাই ছিল তার নিঃশ্বাস।
একদিন একটি কমেন্ট আসে—
“তোমার কবিতায় আমি নিজেকে খুঁজে পাই…”
নামটা ছিল অদ্ভুত— কাঠবিড়ালি
প্রভাত প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু পরের দিন আবার একই নামের মেসেজ আসে।
“আজকের কবিতাটা যেন আমার ভাঙা মনটা জোড়া লাগিয়ে দিল…”
সেই দিন প্রথমবার প্রভাত রিপ্লাই দেয়।
“আপনি কি সত্যিই আমার কবিতা পড়েন?”
সেখান থেকেই শুরু।
প্রথম দিন, দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিন…
ধীরে ধীরে তাদের কথা বলা বাড়ে।
শুধু কবিতা না—জীবন, কষ্ট, হাসি, ছোট ছোট অনুভূতি—সব কিছু শেয়ার করতে শুরু করে তারা।
প্রভাত সারাদিন কী করেছে, কোথায় গেছে—সব বলে কাঠবিড়ালিকে।
আর কাঠবিড়ালি তার দিনের গল্প বলে, তার একাকীত্ব, তার হাসির আড়ালের কষ্ট।
দুজনেই বুঝতে পারে না—কখন এই বন্ধুত্বটা একটা অভ্যাস হয়ে গেছে।
রাত গভীর হয়।
প্রভাত ঘড়ির দিকে তাকায়।
“সে কি আসবে আজ?”
অনলাইন স্ট্যাটাস দেখলেই বুক ধক করে ওঠে।
“Online”
একটা ছোট শব্দ, কিন্তু প্রভাতের কাছে সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তি।
কাঠবিড়ালি একদিন বলে—
“তুমি যদি কখনো লিখা বন্ধ করো, আমি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাবো।”
প্রভাত চুপ থাকে।
তার মনে হয়—এই মেয়ে শুধু পাঠক না, তার লেখার ভেতরের মানুষ।
সময় গড়ায়।
বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে বদলে যায়।
কথার মাঝে আবেগ আসে, আবেগের মাঝে নীরবতা আসে, আর নীরবতার মাঝে জন্ম নেয় এক অদৃশ্য সম্পর্ক—ভালোবাসা।
তারা কেউ কাউকে কখনো দেখেনি। কোনো ফোন নাম্বার নেই। শুধু চ্যাট, শুধু শব্দ, শুধু অনুভূতি।
তবুও প্রভাতের পৃথিবী এখন কাঠবিড়ালি ছাড়া অসম্পূর্ণ।
একদিন কাঠবিড়ালি মজা করে বলে—
“তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো, নাকি শুধু কবিতার মতো ভালো লাগো?”
প্রভাত অনেকক্ষণ টাইপ করে।
তারপর লিখে—
“আমি জানি না ভালোবাসা কেমন হয়… তবে তুমি না এলে আমার দিন শেষ হয় না।”
কাঠবিড়ালি সেই মেসেজ পড়ে অনেকক্ষণ চুপ থাকে।
ধীরে ধীরে সম্পর্ক গভীর হয়।
কাঠবিড়ালি একদিন নিজের এক কাজিনের কথা বলে।
“আমার জীবনে একজন আছে, আমার পরিবার তাকে পছন্দ করে…”
প্রভাত প্রথমে বুঝতে পারে না।
তারপর বুঝে যায়—তার পৃথিবীতে একটা ফাটল ধরছে।
প্রভাত তখন ভালো চাকরি করে। ঢাকায় থাকে। জীবন মোটামুটি স্থির।
কিন্তু সেই স্থির জীবনের ভেতরে হঠাৎ ঝড় আসে।
কাঠবিড়ালির বিয়ে ঠিক হয়ে যায়।
একজন প্রবাসীর সাথে।
প্রভাত যখন এই খবর পায়, সে শুধু চুপ থাকে।
তার ফোনের স্ক্রিনে শুধু একটা নাম জ্বলতে থাকে—
KATHBIRALI
সে অনেকবার টাইপ করে, আবার ডিলিট করে।
শেষে শুধু লিখে—
“তুমি কি খুশি?”
কোনো উত্তর আসে না।
কিছুদিন পর জানা যায়— কাঠবিড়ালির বিয়ে হয়ে গেছে। সে এখন বিদেশে।
প্রভাত সেই দিন প্রথমবার খুব জোরে কেঁদেছিল।
তার কবিতাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
ফেসবুক গ্রুপে কেউ আর তার লেখা পায় না।
দিন যায়, মাস যায়।
প্রভাত ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
সে আর আগের মতো নেই।
চাকরি থাকে, জীবন থাকে—কিন্তু মানুষটা ভেতর থেকে হারিয়ে যায়।
পরিবার তাকে বিয়ে করিয়ে দেয়।
একটা মেয়ের সাথে, যে শান্ত না—বরং অনেক রাগী।
দুজনের মধ্যে শুরু থেকেই ঝগড়া, অভিযোগ, দূরত্ব।
এক ছাদের নিচে থেকেও তারা দুই পৃথিবী।
প্রভাত ধীরে ধীরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
কবিতা লেখা বন্ধ। হাসি বন্ধ। মানুষের সাথে কথা বলা বন্ধ।
সে একসময় ঢাকায় থাকলেও এখন রাস্তার মানুষ।
দিনে যা পায় তাই খায়। কখনো ডাস্টবিন থেকে খাবার। কখনো ছেঁড়া কাপড় গায়ে দেয়।
কিন্তু একটা শব্দ সে কখনো ভুলে না—
“কাঠবিড়ালি”
সে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে হঠাৎ হঠাৎ বলে ওঠে— “কাঠবিড়ালি… তুমি কোথায়?”
মানুষ তাকিয়ে থাকে, কেউ ভাবে পাগল।
সে এখন এয়ারপোর্ট এলাকায় ঘোরে।
কারণ তার ভেতরে এক অদ্ভুত বিশ্বাস— কাঠবিড়ালি কোনোদিন ফিরবে।
এদিকে কাঠবিড়ালি বিদেশে।
তার জীবন এখন অন্য কারো সাথে।
চেহারায় হাসি আছে, কিন্তু চোখে কোথাও একটা শূন্যতা।
একদিন সে তার স্বামীর সাথে এয়ারপোর্টে আসে।
বিদেশে চলে যাবে।
সবকিছু ঠিকঠাক।
জ্যাম।
গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে এয়ারপোর্ট গেটের সামনে।
হঠাৎ কাঠবিড়ালি জানালার বাইরে তাকায়।
ডাস্টবিনের পাশে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
ছেঁড়া কাপড়, এলোমেলো চুল, হাতে পচা রুটি।
সে কিছু একটা বলছে বারবার—
“কাঠবিড়ালি… কাঠবিড়ালি…”
কাঠবিড়ালির শরীর থমকে যায়।
সে দ্রুত ফোন বের করে পুরোনো চ্যাট দেখে।
পুরোনো নাম—
প্রভাত
তার বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে যায়।
সে গাড়ির গ্লাস নামায়।
চিৎকার করে ডাকে—
“প্রভাত!”
“প্রভাত আমি কাঠবিড়ালি!”
কিন্তু রাস্তার মানুষটা তাকায় না।
সে শুধু রুটিটা হাতে নিয়ে আবার বলে—
“কাঠবিড়ালি… কোথায় তুমি…”
তার চোখে কোনো চিনতে পারার আলো নেই।
কাঠবিড়ালি কাঁদতে কাঁদতে আবার ডাকে—
“প্রভাত… আমি চলে যাচ্ছি…”
কিন্তু তখন বিমানবন্দরের ঘোষণা বাজে।
সময় শেষ।
সে একবার ফিরে তাকায়।
দূরে প্রভাত দাঁড়িয়ে আছে।
ডাস্টবিনের পাশে, পচা রুটি হাতে, অস্পষ্ট কণ্ঠে আবার ডাকছে—
“কাঠবিড়ালি…”
গাড়ি এগিয়ে যায়।
পেছনে থেকে যায় একটি অসমাপ্ত ভালোবাসা— যার শুরু ছিল শব্দে, আর শেষ হলো নীরবতায়।