04/05/2026
২০১৩ সালের ৪, ৫, ৬ মে - আন্দোলন, সংগ্রাম আর রক্তাক্ত ইতিহাস।
৪ তারিখে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশে যোগ দিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা চলে এসেছিলাম ঢাকায়। সারাদিন সফল সমাবেশ করি তবে কিছু কিছু সমস্যার উপক্রম হয়েছিলো যেটা সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিলো। পরের দিন ৫ মে হেফাজতের সমাবেশে যোগদানের প্রস্তুতি ছিলো। সেদিন অনেকেই ১৩ দফা দাবি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল না থাকলেও সবাই মূলত আওয়ামী সরকারের পতনের আকাঙ্ক্ষাকেই হৃদয়ে ধারণ করে নিয়েছিলো। ৫ তারিখ দুপুর ১২ টার মধ্যেই শাপলা চত্বর সহ স্লোগানে স্লোগানে আশেপাশের সমস্ত এলাকা জনসমাগম হয়ে যায়। দুপুর ২ টা বাজতেই খবর আসে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেইটের ঐ পাশে আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে থেকে হেফাজতের সমাবেশে যোগ দিতে আসা লোকজনকে আক্রমণ করা হয় এমনকি গুলিও করেছে সন্ত্রাসীরা। এতে গুলিবিদ্ধ লোককে কোলে তুলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া হচ্ছিল। চোখের সামনে এসব দেখতে পেয়ে সেখানে দৌড়ে যাই এবং সবাই মিলে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও তুমুল সংঘর্ষের পর কিছুটা প্রতিহত করা হয়। আমি পিচঢালা রাস্তায় হুচট খেয়ে খেয়ে আহত হই, রক্তাক্ত হই। সমাবেশ চলতেই থাকে। সরকারদলীয় ক্যাডারদের এ ধরনের আক্রমণের কারণেই মূলত বিকেলে সমাবেশ থেকে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আর তখন থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন পরিস্থিতি। সন্ধ্যায় সরকারি সমস্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুরু করে আক্রমণ। কিন্তু জনতা সারারাত অবস্থান করার জন্য প্রত্যয় ব্যক্ত করে। হেফাজত কর্মীদের সাথে জামাতের নেতা কর্মীরা এগিয়ে এসেছিলো, আমরা শিবিরের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছিলাম, বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি এবং অংগ সংগঠনের সবাইকে সহযোগিতা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে তারা কতটুকু সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলো সে ব্যাপারে আমার জানা নেই। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের আক্রমণ এবং পুলিশ-র্যাব এর টিয়ারগ্যাস, গ্রেনেড, গরম পানি, ট্যাংক, গুলির সামনেই ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, অবস্থানসহ আমাদের সাধ্যমত লড়াই অব্যাহত রাখি। আমার মাথায় কয়েকবার রাবার বুলেট এসে হিট করে, টিয়ারগ্যাস এর ধোঁয়ায় চোখে মুখে অন্ধকার নেমে আসলে আগুন জ্বালিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাই। কখনো গরম পানি নিক্ষেপ করা হয় আবার গ্রেনেডের বিকট আওয়াজে কানে তালি লেগে যায়। কখনো আবার আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদেরকে সুযোগ বুঝে বুঝে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু সামাল দিয়ে দিয়ে লড়াইটা চলমান ছিলো। আমাদের সাহসী পদক্ষেপে সারারাত পুলিশ এবং সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। সমস্ত ঢাকা শহর একটা ম্যাসাকারে পরিণত হয়। ভোর সকাল অব্দি অবস্থান ধরে রেখেছিলাম। সারারাত আমাদের আন্দোলনকে সমর্থন করে বিভিন্ন ভবন থেকে আমাদের খাবার, পানি ইত্যাদি প্রয়োজনীয় অনেক কিছু দিয়ে অনেকেই সহযোগিতা করেছিলো। ৬ মে ভোর সকালে বেদনাসিক্ত হৃদয়ে আমরা স্বীদ্ধান্ত নেই ঢাকা ত্যাগ করার। আহত, ক্ষত বিক্ষত অবস্থায় ঢাকা থেকে ট্রেনে রওয়ানা করি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। তবে চট্টগ্রামে ফেরার গল্পটাও অনেক কঠিন ছিলো। প্রত্যেকটা স্টেশনে স্টেশনে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের ক্যডাররা চেক দিচ্ছিলো। বিশেষ করে মাদ্রাসার যে সমস্ত ছাত্ররা পায়জামা পাঞ্জাবি টুপি পরিহিত অবস্থায় স্টেশনে নামছিলো আর যাদেরকেই সন্দেহ হচ্ছিলো তাদেরকে টার্গেট করে করে ধরা হচ্ছিল এবং বেধড়ক ভাবে পিটানো হচ্ছিলো। চট্টগ্রাম স্টেশনে এটা আরও বেশি হয়েছিলো। বিশেষ করে এই ঘটনার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের আলেম ওলামাদের সমর্থন হারাতে থাকে। তবে শেখ হাসিনা পরবর্তীতে কওমী আলেমদেরকে কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়ে কওমী জননী উপাধি নেন তার ব্যর্থতা ঢাকার জন্য। এই ছিলো সেদিনগুলো; জীবন থেকে নেয়া রক্তাক্ত ইতিহাস।