সৃজন উৎসব শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। কোজাগরী পূর্ণিমায়। সে-সময় এই মেলা দুদিনের হতো। দু-এক বছর পরে গুরু নানকের জন্মদিনে এই উৎসবের আয়োজন করা হয় এবং দু-দিনের বদলে তিনদিন ব্যাপী মেলা চলতে থাকে।
সৃজন উৎসবকে বলা হয়--বাংলায় ভারতমেলা। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের বিভিন্ন রাজ্যের শিল্পীরা এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। যেমন-- আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, ত্রিপুরা, রাজস্থান, গুজরাট ইত্যাদি।প্রতিবছর তিনটি মঞ্চে প্রায় সা
ত-আটশো শিল্পী অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন। তিনদিনে প্রায় আড়াই-তিনলক্ষ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। ঝাড়খণ্ড, বিহার ছাড়াও কোলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এই উৎসব দেখতে আসেন।
এই উৎসবের উদ্বোধন হয় না, অনুষ্ঠান মঞ্চে ভাষণও হয় না, কোনো নেতা-মন্ত্রীদের ডাকা হয় না। এই উৎসবের সঙ্গে কোনো ধরনের দলীয় রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এই উৎসব দেখতে সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের বহু স্বনামধন্য ব্যক্তি এসেছেন। যেমন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, শিল্পী প্রকাশ কর্মকার, শুভাপ্রসন্ন, চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ, রাজা মিত্র, গৌতম হালদার ইত্যাদি।
এই মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে যারা যারা দোকান নিয়ে আসেন, তাঁদের কাছ থেকে দোকানের ভাড়াবাবদ কোনো টাকা নেওয়া হয় না। উপরন্তু তাদের জল, বিদুৎ এবং তিনদিন ধরে বিনে পয়সায় দুপুর এবং রাতের খাবার দেওয়া হয়। শুধু মাত্র সরকারি স্টলের জন্য নির্দিষ্ট ভাড়া নেওয়া হয়।
stage-এর প্রতিশব্দ হিসেবে মঞ্চ শব্দটি এখানে ব্যবহৃত হয় না। তার বদলে বলা হয় শিল্পপীঠ। টিলার মাথায় মাথায় এই শিল্পপীঠগুলি নির্মাণ করা হয়। তাদের নাম--মহেন্দ্র শিল্পপীঠ, চিত্রকুট শিল্পপীঠ, কিষ্কিন্ধ্যা শিল্পপীঠ ইত্যাদি। পুরাণ তথা রামায়ণ -মহাভারত থেকে এই নামগুলি নিয়ে মঞ্চের নামকরণ করা হয়েছে।
অনেকগুলি টিলাকে নিয়ে চারপাশে জঙ্গল ঘেরা যে-স্থানে সৃজন উৎসব সম্পন্ন হয়, তাকে বলা হয় সৃজনভূৃমি। সৃজনভূমির টিলার মাথায় দাঁড়ালে অদূরে চাঁদের আলোয় চকমক করতে থাকা মুকুটমণিপুরের জলরাশি দেখা যায়। মাথার ওপরে থাকে রাসপূর্ণিমার মস্ত ঝলমলে চাঁদ। এই সব নিয়ে সৃজনভূমির নৈসর্গিক পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম।
প্রকৃতির সান্নিধ্যে এই মেলা করা হয়। যাতে মানুষ প্রকৃতিকে উপভোগ করতে পারেন, মানুষের মনে প্রকৃতির প্রতি প্রেম এবং সৃজনশীল জেগে ওঠে, যে-কারণে এই মেলার নামকরণ করা হয়ে 'সৃজন উৎসব'।
আমাদের এই মেলা বা উৎসব এর প্রাণপুরুষ ও কর্ণধার শ্রী সৈকত রক্ষিত মহাশয় পুরুলিয়া জেলার বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে কাঁধে ঝোলা নিয়ে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, সেইভাবে ঘুরতে ঘুরতে একবার খড়িদুয়ারা-কুমার গ্রামের এই টিলাগুলি দেখতে পেয়ে, সাইকেলে রেখে টিলার মাথায় উঠে পড়েন। ওপরে ওঠার পর এর প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। তখন এই সুন্দর জায়গাটি আরো অনেক মানুষকে দেখানোর ভাবনা তাঁর মনে আসে। সেই থেকে এখানে এই সৃজনভূমিতে উৎসব করার পরিকল্পনা মাথায় আসে।
তখন তিনি ভাবেন, এমন একটা উৎসব করবো যা সমগ্র দেশের অখণ্ডতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরবে। এবং এই সৃজন উৎসব বেচাকেনার মেলা হবে না, তা হবে চেতনা এবং মানবপ্রেমের উৎসব।